দেশের প্রথম সারির বেসরকারি হাসপাতালগুলোর মধ্যে এভারকেয়ার হসপিটাল অন্যতম। হাসপাতালটিতে অত্যাধুনিক স্বাস্থ্যসেবা, উন্নত প্রযুক্তি, সার্বক্ষণিক জরুরি সেবা রয়েছে। হাসপাতালটিতে কার্ডিয়াক সায়েন্স (ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজি ও কার্ডিওভাসকুলার থোরাসিক সার্জারি), কার্ডিয়াক আইসিইউ (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) সেবাসহ মোট ২৬টি বিভাগ রয়েছে। ডা. আরিফ মাহমুদ এভারকেয়ার হসপিটাল বাংলাদেশে ডিরেক্টর (মেডিকেল সার্ভিসেস) হিসেবে কর্মরত আছেন। তিনি দেশে হৃদরোগ চিকিৎসা ব্যবস্থার বিবর্তন এবং এভারকেয়ার হাসপাতালের হৃদরোগ চিকিৎসাসেবা নিয়ে কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মুহাম্মাদ শফিউল্লাহ।
বাংলাদেশের কার্ডিয়াক চিকিৎসায় কী কী উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে?
বাংলাদেশ গত দেড়-দুই দশকে কার্ডিয়াক চিকিৎসায় অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে। সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলো সমানতালে এ সেবা দিয়ে আসছে। বর্তমানে কার্ডিয়াক কোনো চিকিৎসার জন্য রোগীদের বিদেশ যাওয়ার প্রয়োজন পড়ছে না। এ রোগের ৯৫ ভাগ চিকিৎসাই এখন বাংলাদেশে করা সম্ভব। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে এ চিকিৎসার ব্যবস্থা বেশির ভাগই রাজধানীকেন্দ্রিক। ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম, খুলনা ও সিলেটে এ রোগের চিকিৎসা ব্যবস্থা রয়েছে। রাজশাহী ও রংপুরে সীমিত পর্যায়ে এ রোগের চিকিৎসা শুরু হয়েছে। ফলে ঢাকার বাইরের রোগীদের যখন হার্ট অ্যাটাক বা বুকে ব্যথা হয় তখন তাদের চিকিৎসার জন্য ঢাকায় আসতে হয় এবং তাতে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রেই রোগী হাসপাতালে পৌঁছাতে পৌঁছাতেই মৃত্যুবরণ করে। এ অসুবিধা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য হৃদরোগের চিকিৎসাসেবা প্রত্যেকটা জেলা শহরে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তাহলে হৃদরোগীদের ঢাকামুখী চাপ অনেকটা কমে যাবে এবং রোগীরা নিকটস্থ জেলা শহরেই তাদের চিকিৎসাসেবা পেয়ে যাবে। সরকার এরই মধ্যে উদ্যোগ নিয়েছে এবং ক্যাথল্যাব, সিসিইউ প্রতিষ্ঠা করেছে এবং বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ও অন্যান্য জনবল নিয়োগ দিয়েছে। সুতরাং প্রতিটি জেলার কার্ডিয়াক হাসপাতালগুলোকে স্বাস্থ্যসেবা দিতে হবে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশে হৃদরোগের প্রকোপ অনেক বেশি। বিভিন্ন পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বাংলাদেশের মোট মৃত্যুর ২৭ শতাংশ ঘটে হৃদরোগের কারণে। এ রোগে মৃত্যুর সংখ্যা ও ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। এক্ষেত্রে প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধের দিকে বেশি নজর দিতে হবে। আমি যেহেতু জনস্বাস্থ্য ও হাসপাতাল ম্যানেজমেন্ট নিয়ে কাজ করি সেহেতু আমি প্রতিরোধের ওপরেই বেশি গুরুত্ব দিই। বিভিন্ন হাসপাতালে প্রিভেন্টিভ কার্ডিওলজি বিভাগ চালু করতে হবে।
বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা পুরোপুরি রাজধানীকেন্দ্রিক। স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগের আগ্রহও কেন রাজধানীকেন্দ্রিক হচ্ছে?
আসলে যারা স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠা করেন তারা বিষয়টাকে একটি বিনিয়োগ ও ব্যবসা হিসেবে দেখেন। যেহেতু রোগীরা সব ঢাকায় আসে তাই সবাই ঢাকায় হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করতে চায় যাতে পরবর্তী সময়ে টাকাটা উঠে আসে। ভারতের প্রত্যেকটা শহর ও স্টেটে বড় বড় হাসপাতাল আছে এবং প্রত্যেকটা হাসপাতালের বিভিন্ন শাখা বিভিন্ন শহরে রয়েছে। সুতরাং সে দেশের জনগণ হাতের নাগালেই চিকিৎসাসেবা পায়। আমাদের মনোভাব বদলাতে হবে। সুতরাং সব হাসপাতাল ঢাকায় না করে বিভাগীয় শহরসহ জেলা শহরগুলোয় প্রতিষ্ঠা করার দিকে নজর দিতে হবে। তাহলেই চিকিৎসাসেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাবে। বাংলাদেশে হৃদরোগকে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ভাগ করা যায়; যেমন—শিশুদের জন্মগত রোগ, হার্টের ভালভের রোগ, হার্টের মাংসপেশির রোগ, কম্পনজনিত রোগ, রক্তনালির রোগ ইত্যাদি। বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে যদি আমরা তুলনা করি তাহলে সব ধরনের চিকিৎসা আমাদের দেশে হয়। শুধু একটা চিকিৎসায় আমরা পিছিয়ে আছি সেটা হলো হার্ট ট্রান্সপ্লান্ট। এ প্রোগ্রামটা আমরা এখনো আমাদের দেশে শুরু করতে পারিনি। হার্ট ট্রান্সপ্লান্ট বাদে বাকি সব ধরনের চিকিৎসা সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে হয়। হৃৎকম্পনজনিত রোগের চিকিৎসা ১০ বছর আগেও অপ্রতুল ছিল, কিন্তু বর্তমানে এ চিকিৎসাই বাংলাদেশের অনেক অগ্রগতি লাভ করেছে।
ঢাকায় এভারকেয়ার আছে। চট্টগ্রামেও আছে। ঢাকার মতো চট্টগ্রামেও বিশেষায়িত চিকিৎসা দিতে পারছেন কিনা। সেখানে কার্ডিয়াক ব্যবস্থাপনা কেমন?
এভারকেয়ার ঢাকা শুরু হয় ২০০৫ সালে। উদ্যোগক্তাদের উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের রোগীদের আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা। সঙ্গে সঙ্গে বিভাগীয় শহরগুলোয় হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১১ সালে চট্টগ্রাম হাসপাতালের কাজ শুরু হয়। ২০১৯ সালে চট্টগ্রাম হাসপাতাল চিকিৎসাসেবা শুরু করে। ঢাকার মতো এভারকেয়ার হাসপাতাল চট্টগ্রামে হৃদরোগীদের চিকিৎসার সমান ব্যবস্থা রয়েছে; যেমন—হৃদরোগীদের ডায়াগনস্টিকের জন্য আছে ইকোকার্ডিওগ্রাম, সিটি এনজিওগ্রাম, ইটিটি, হোল্টার মনিটরিং ইত্যাদি। এছাড়া রয়েছে স্টেট অব আর্ট সিসিইউ, ক্যাথল্যাব। চট্টগ্রামে শিশুদের সার্জারি ছাড়া ইন্টারভেনশনের মাধ্যমে পেডিয়াট্রিক ইন্টারভেনশন কার্ডিওলজি সেবা অব্যাহত রয়েছে। এনজিওগ্রাম, এনজিওপ্লাস্টি, প্রাইমারি পিসিআই, পেসমেকার আইসিটি দক্ষতার সঙ্গে করা হচ্ছে। এছাড়া সব ধরনের কার্ডিয়াক সার্জারির ব্যবস্থা আছে।
হৃদরোগের ক্ষেত্রে ইমার্জেন্সি স্বাস্থ্যসেবাটা জরুরি। দেশের সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে এ জরুরি সেবাটা কি দেখা যাচ্ছে?
হৃদরোগের চিকিৎসার ক্ষেত্রে ইমার্জেন্সি বা জরুকি চিকিৎসাসেবা অন্যতম ভূমিকা পালন করে। যেমন একজন রোগীর বুকে ব্যথা হলে তাকে অবশ্যই ৯০ মিনিটের মধ্যে নিকটস্থ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যেতে হবে এবং সঙ্গে সঙ্গে রোগীকে আন্তর্জাতিক গাইডলাইন মেনে ট্যাবলেট অ্যাসপিরিন বা ক্লপিড দিতে হবে। তারপর প্রয়োজনে ইঞ্জেকশন স্ট্রেপটোকাইনেস দিতে হবে এবং পরবর্তী সময়ে রোগীর রক্তনালির ব্লক খোলার জন্য ক্যাথল্যাবে নিয়ে এনজিওগ্রাম করাতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে রোগ নির্ণয়ের জন্য ইসিজি ও ট্রপোনিন আইসহ অন্যান্য পরীক্ষা করাতে হবে। এ সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি ৯০ থেকে ১২০ মিনিটের মধ্যে শেষ করতে হবে। কিন্তু দেখা যায় বেশির ভাগ হাসপাতালে জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই। এছাড়া দূর-দূরান্ত থেকে রোগীদের ছুটে আসতে হয় ঢাকায়, যেখানে তাদের মূল্যবান সময় নষ্ট হয় এবং বিভিন্ন হাসপাতালে ঘুরে নির্দিষ্ট সেবা পাওয়ার আগেই ৫০ ভাগ রোগী মৃত্যুবরণ করে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য প্রতিটি হাসপাতালে ও জেলায় জেলায় জরুরি কার্ডিয়াক সেবা চালু করা অতীব জরুরি।
দীর্ঘদিন ধরেই হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় কাজ করছেন। বাংলাদেশে বেসরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সুবিধা ও অসুবিধা কেমন?
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবার অবকাঠামো বিশ্বের অনেক দেশের কাছেই রোলমডেল। এ অবকাঠামো তিনটি স্তরে ভাগ করা যায়; যেমন—মেডিকেল ইউনিভার্সিটি, মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল এবং বিশেষায়িত হাসপাতাল তৃতীয় স্তরে রয়েছে। জেলা হাসপাতাল, মা ও শিশু কেন্দ্র মাধ্যমিক স্তর হিসেবে বিবেচিত। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র, কমিউনিটি ক্লিনিক হচ্ছে প্রাথমিক স্তরের স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী। বিভিন্ন এনজিও ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও এ জটিল স্বাস্থ্য নেটওয়ার্কে অবদান রাখে। বাংলাদেশ একটি জনবহুল দেশ। ১৭-১৮ কোটি জনগণের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়। এর জন্যই বেসরকারি হাসপাতালের যাত্রা হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরপর নার্সিং হোম, পলি ক্লিনিকের মাধ্যমে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবার জন্ম। আশি-নব্বইয়ের দশকে ঢাকায় বড় বড় ডায়াগনস্টিক সেন্টারের প্রসার ঘটে এবং সঙ্গে সঙ্গে ১০০-১৫০ শয্যার প্রাইভেট হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ২০০০ সালের পর করপোরেট হাসপাতালগুলোর বিকাশ ঘটে। এ করপোরেট হাসপাতালগুলোর উদ্দেশ্য ছিল সার্বক্ষণিক বিশেষজ্ঞ ডাক্তার, নার্স, টেকনিশিয়ানদের মাধ্যমে রোগীদের আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসাসেবা দেয়া। সর্বোপরি রোগীদের বিদেশ যাত্রা কমিয়ে আনা। বর্তমানে সরকারি স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবাও দেশের স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
দেশের হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা কী বলে আপনি মনে করছেন?
সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে সীমাবদ্ধতায় কিছু সাদৃশ্য থাকলেও অমিলও বিদ্যমান। উভয় ক্ষেত্রেই প্রধান সমস্যা হচ্ছে স্বাস্থ্যসেবার জনবলের ঘাটতি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মানদণ্ড অনুযায়ী ১০ হাজার জনসংখ্যার বিপরীতে ২৩ জন নার্স থাকার কথা। কিন্তু বাংলাদেশে আছে ১০ হাজারের বিপরীতে মাত্র ছয়জন চিকিৎসক, নার্স ও মিডওয়াইফ। সুতরাং ৭৪ শতাংশ ঘাটতি নিয়ে আমরা চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছি। এক হাজার মানুষের জন্য চারজনের বেশি চিকিৎসক, নার্স ও মিডওয়াইফ থাকার দরকার, যেখানে বাংলাদেশে আছে একজনের সামান্য বেশি। দক্ষিণ এশিয়ার স্বাস্থ্যসেবায় জনবলে পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। এ জনবলের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান আফগানিস্তানের আগে মানে সপ্তম। এছাড়া সরকারি হাসপাতালের শয্যা সংখ্যার দ্বিগুণ-ত্রিগুণ রোগী ভর্তি থাকে এবং এ অতিরিক্ত রোগীদের হাসপাতালের বারান্দায়, সিঁড়িতে থাকতে হয়। সুতরাং বাংলাদেশের ডাক্তার ও নার্সরা অনেক কষ্টের মাধ্যমে তাদের ক্ষমতার চেয়ে বেশি সেবা দেন। এছাড়া সরকারি হাসপাতালের সীমাবদ্ধতা হলো ইনফেকশন কন্ট্রোল পলিসি মেনে চলা, দর্শনার্থী নিয়ন্ত্রণ করা, বায়োমেডিকেল চিকিৎসা সরঞ্জাম নষ্ট হলে সেগুলো মেরামত করতে দীর্ঘসূত্রতাসহ অন্যান্য।
বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের প্রধান সমস্যা হচ্ছে বাজেট ও বাজেটের অ্যালোকেশন।
বিশেষজ্ঞ ডাক্তার, নার্স ও টেকনিশিয়ান পেতেও সমস্যা হয়। চিকিৎসাসেবায় নার্স অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বর্তমানে বাংলাদেশে তিন লাখ নার্সের দরকার আছে, কিন্তু সেখানে আছে এক লাখের সামান্য কম। এখানে উল্লেখ্য, প্রতি বছর বহুসংখ্যক নার্স সরকারি চাকরিতে যোগদান করে। ফলে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা অনেকটাই মুখ থুবড়ে পড়ে। সুতারং আমাদের নার্সের সংখ্যা বাড়ানোর জন্য এবং তাদের গুণগত মান বাড়ানোর জন্য প্রকল্প হাতে নিতে হবে।
হৃদরোগের চিকিৎসায় বেসরকারি ব্যবস্থাপনা প্রসারে কী কী পদক্ষেপ এ মুহূর্তে নেয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন?
প্রথমে জেলা শহরগুলোয় পরিপূর্ণ হৃদরোগ চিকিৎসা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। যেমন ক্যাথল্যাব, সিসিইউ ইত্যাদি। এ প্রতিষ্ঠানগুলোয় প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার জন্য ডাক্তার, নার্স ও টেকনিশিয়ানদের উচ্চতর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। এসব কেন্দ্রের সেবা প্রদানকারী জনবলকে স্থায়ী করার জন্য এবং তাদের স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। বর্তমানে বাংলাদেশে হার্ট ট্রান্সপ্লান্ট করা হয় না। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে এক হাজারেরও বেশি হার্ট ট্রান্সপ্লান্ট করা হয়। সুতরাং হার্ট ট্রান্সপ্লান্ট প্রসারের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নিতে হবে। শিশুর জন্মগত হৃদরোগের চিকিৎসার ব্যবস্থা আরো এগিয়ে নেয়ার জন্য আমাদের বেশি বেশি প্রতিষ্ঠান স্থাপন করতে হবে। আমাদের দেশে প্রচুর জন্মগত হৃদরোগের শিশু ভারতের ভেলোর ও নারায়না হেলথ সেন্টারে চলে যায়। সুতরাং আমাদের এখনই ব্যবস্থা নিতে হবে।
আমরা সরকারি-বেসরকারি যে ব্যবস্থাপনাই বলি তা উন্নত হয়েছে, মান বেড়েছে। উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার হচ্ছে। কিন্তু রোগ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে এসব প্রতিষ্ঠানের প্রায়োগিক কোনো ভূমিকা দেখছেন?
দৃশ্যত সে রকম কোনো ভূমিকা চোখে পড়ে না। কিন্তু এ রোগ প্রতিরোধের জন্য আমাদের নজর দিতে হবে এবং প্রতিটা হাসপাতালে প্রিভেন্টিভ কার্ডিওলজি বা ওয়েলনেস সেন্টার গড়ে তুলতে হবে। এসব সেন্টারে শুধু রোগ যাতে না হয় সে সম্পর্কে বিভিন্ন জ্ঞান দেয়া হবে এবং রোগ প্রতিরোধের উপায় সম্পর্কে বিভিন্ন প্রোগ্রাম থাকবে। এছাড়া রোগীর খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে, ব্যায়াম ও মেডিটেশন সম্পর্কে প্রতিনিয়ত সেশন নিতে হবে। সেই সঙ্গে জনগণ যাতে ধূমপান, তামাক, জর্দা না খায় এবং পরিবেশগত দূষণ থেকে পরিত্রাণের জন্য বিভিন্ন ক্লাস নেয়া হবে। সঙ্গে সঙ্গে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম হাতে নিতে হবে। ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়া জনসচেতনতার জন্য অনেক ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করে যাচ্ছে। আমি মনে করি, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ও মিডিয়া হাউজগুলো সমন্বয় করে কাজ করলে হৃদরোগের প্রকোপ অনেকটা কমিয়ে আনা সম্ভব।
উন্নত বিশ্বের হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা এবং পরিচালনার সঙ্গে বাংলাদেশের হাসপাতাল পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে আপনার কী পর্যবেক্ষণ রয়েছে?
বিশ্বের উন্নত দেশগুলোয় এভিডেন্স বেইজড (প্রমাণমূলক) চিকিৎসা দেয়া হয়। সব হাসপাতালে একই ধরনের রোগীকে একই নিয়ম মেনে, একই চিকিৎসাসেবা দেয়া হয়। যেমন স্ট্রোক নিয়ে যদি একজন রোগী কোনো হাসপাতালে যায় তাহলে এ ধরনের প্রটোকল মেনে চিকিৎসাসেবা দেয়া হয়। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো আমরা এ প্রটোকল বেইজড (নির্দিষ্ট নিয়ম বা নির্দেশিকা) চিকিৎসাসেবা চালু করতে পারিনি। বিশ্বের সব দেশেই চিকিৎসাসেবার মান নিয়ন্ত্রণের জন্য হসবিটাল অ্যাক্রিডিটিশনের ব্যবস্থা আছে। আর না থাকলে তারা ইন্টারন্যাশনাল অ্যাক্রিডিটিশন (জেসিআই) এর সনদ লাভ করে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশে এখনো আমরা আমাদের নিজস্ব অ্যাক্রিডিটিশন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারিনি। আমাদের নিজস্ব অ্যাক্রিডিটিশন না থাকার ফলে আমরা (এভারেকেয়ার হাসপাতাল ঢাকা) আমেরিকার জেসিআই সনদের জন্য আবেদন করি। জেসিআই হলো একটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক স্বাস্থ্য সংস্থা, যা বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্যসেবার মান ও নিরাপত্তা উন্নতির জন্য নিবেদিত। ঢাকা হাসপাতালটি বাংলাদেশের প্রথম হাসপাতাল হিসেবে ২০০৮ সালে জেসিআিই সনদ লাভ করে। উল্লেখ্য, একটি সনদ তিন বছরের জন্য বহাল থাকে। আমরা এ পর্যন্ত পরপর পাঁচবার জেসিআই স্বীকৃত সনদ লাভ করে রোগীদের সেবা দিয়ে আসছি। সম্প্রতি ২০২৩ সালে ইউনাইটেড হাসপিটাল লিমিটেড জেসিআই সনদ লাভ করে। এছাড়া ল্যাবএইড হাসপাতাল ভারতের এনএবিএইচ সনদ লাভ করে। উন্নত দেশে ডিজিটাল পদ্ধতির মাধ্যমে রোগীদের সন্তুষ্টি পরিমাপ করা হয়। আমাদের দেশেও বিভিন্নভাবে রোগীদের সন্তুষ্টির জরিপ করা হয়, কিন্তু সেন্ট্রালি এখনো কিছু শুরু হয়নি।
দেশের হৃদরোগের চিকিৎসার ক্ষেত্রে বেসরকারি স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের সন্তুষ্টি নিয়ে আপনার মন্তব্য কী?
আমি আগেই বলেছি, হৃদরোগের প্রায় ৯৫ শতাংশ চিকিৎসাসেবা বাংলাদেশের ডাক্তাররা বিভিন্ন হাসপাতালে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে দিয়ে আসছে। আমাদের বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররা আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছেন। আমাদের সফলতার হার ঈর্ষণীয় এবং আমাদের চিকিৎসক এবং তাদের সেবা নিয়ে আমি গর্ববোধ করি। আমাদের রোগীরাও বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ফোরামে তাদের সন্তুষ্টির কথা বলেছেন।
চিকিৎসা ব্যয় কমানোর ক্ষেত্রে সময়োপযোগী কী পদক্ষেপ নেয়া গুরুত্বপূর্ণ?
বাংলাদেশের জনগণের কোনো স্বাস্থ্য বীমা নেই। রোগীদের চিকিৎসা খরচ তাদের নিজেদের বহন করতে হয়। অনেক সময় রোগীদের জমিজমা, গহনা বিক্রি করে, ধার করে চিকিৎসাসেবার ভার বহন করতে হয়। সুতরাং বাংলাদেশের রোগীদের স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় কমানোর জন্য স্বাস্থ্য বীমা প্রতিষ্ঠা করা সময়ের দাবি। পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) মাধ্যমে হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করলে রোগীদের চিকিৎসা খরচ অনেকটা কমে আসবে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, মালেশিয়া, ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম-এ পিপিপি মডেলের মাধ্যমে রোগীদের চিকিৎসা ব্যয় কমিয়ে এনেছে।