Text Interviews

হৃদরোগীকে বিশেষায়িত হাসপাতালে পাঠানোর আগের ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ

15 November 2023 | by Muhammad Shafiullah

দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশে হৃদরোগের চিকিৎসাসেবা দিচ্ছে ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হসপিটাল এন্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট। সময়ের প্রয়োজনে প্রতিষ্ঠানটি তার সেবার পরিসর বৃদ্ধি করেছে। মানসম্মত হৃদরোগের চিকিৎসার জন্য মানুষ ভরসা করছে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত এ হাসপাতালকে। দেড় দশক ধরে এ হাসপাতালের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করছেন অধ্যাপক ডা. এমএ রশীদ। হৃদরোগের চিকিৎসায়, অধ্যাপনা, গবেষণা, সমাজসেবা ও হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় তার অভিজ্ঞতা দীর্ঘদিনের। দেশের হৃদরোগের চিকিৎসায় ক্রমবিকাশ ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মুহাম্মাদ শফিউল্লাহ।

ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতালের কার্যক্রম শুরুর সময়ে কার্ডিয়াক চিকিৎসার পরিস্থিতি সম্পর্কে বলুন।
ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতাল এন্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির অন্যতম স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। নব্বইয়ের দশকে দেশে উন্নতমানের কার্ডিয়াক চিকিৎসা কেন্দ্র ছিল না। তখন কার্ডিয়াক চিকিৎসার জন্য ছিল একমাত্র জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল। তখন দেশের জনসংখ্যা ছিল ১০ কোটির বেশি। বিশাল এ জনসংখ্যার জন্য চিকিৎসাসেবা ছিল অপ্রতুল। যারা হৃদরোগে আক্রান্ত অথবা হৃদরোগের ঝুঁকিতে ছিলেন তারা উন্নত চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে চলে যেতেন। মূলত তারা ভারত, থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুর যেতেন। যাদের সামর্থ্য ছিল তারাই দেশের বাইরে যেতেন। মধ্যবিত্তদেরও অনেকে দেশের বাইরে চিকিৎসা নিয়েছেন এমনটিও দেখা যেত। ফলে প্রচুর পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশের বাইরে চলে যেত। আর সেটা বৈধপথে নয়, অবৈধ উপায়ে। দেশের বাইরে চিকিৎসা করতে গেলে বৈধ উপায়ে কিছু নিয়ম পালন করতে হয়। অনেকেই সহজ উপায়ে অবৈধভাবে দেশের অর্থ ব্যয় করে চিকিৎসা নিতে যেতেন। এভাবে দেশের প্রচুর টাকা বিদেশে চলে গেছে। ওই সময়ে বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি চিন্তা করল যদি হৃদরোগের চিকিৎসার জন্য দেশে সুব্যবস্থা করা যায় তাহলে এ লোকগুলো দেশেই চিকিৎসা নেবে। এটা দেশের সব শ্রেণীর মানুষের জন্য যেমন ভালো হবে, তেমনি বড় অংকের টাকা দেশেই থাকবে। একই সঙ্গে দক্ষ জনবলও তৈরি হবে। এই তিনটা বিষয় বিবেচনা করে বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির সভাপতি জাতীয় অধ্যাপক ডা. এ কে আজাদ খান চিন্তা করলেন আমরা এ ধরনের একটি প্রতিষ্ঠান করলে মানুষের আস্থা অর্জন সম্ভব হবে। এ ভাবনা নিয়ে তিনি বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি ও সুইডেনের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ ব্যবস্থাপনায় এখানে একটা সেন্টার প্রতিষ্ঠা করেন। তখন তার নাম ছিল সুইডবাংলা হার্ট সেন্টার, পরে এটার নামকরণ করা হয় বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি কার্ডিয়াক সেন্টার (ড্যাব কার্ডিয়াক সেন্টার)।

২০০১ সালে তৎকালীন ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সুইডবাংলা হার্ট সেন্টার উদ্বোধন করেছিলেন। ২০০৩ সালে সুইডবাংলা কার্ডিয়াক সেন্টার নামেই কাজ শুরু হয়। কিন্তু যেসব শর্তে সুইডবাংলাকে হাসপাতালের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল তারা সেটা পূরণ করতে সক্ষম হননি। তার কারণে পরে ডায়াবেটিক সমিতি সুইডবাংলার সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে। এরপর নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ইব্রাহিম কার্ডিয়াক নামে এর যাত্রা শুরু হয়েছিল।

আমি এখানে ২০০৭ সালে যোগ দিই। তখনো এখানে ব্যাপকভাবে কাজ শুরু হয়নি। এই সেক্টরে তখন বেশকিছু সমস্যা ছিল। সেন্টারটি ৩০-৩৫ কোটি টাকা দায়গ্রস্ত ছিল। এখানে শয্যাসংখ্যা ছিল মাত্র ৬২। আমি এখানে জাতীয় অধ্যাপক একে আজাদ খানের নির্দেশনায় কাজ শুরু করি। আর সময়ের ক্রমধারায় এ হাসপাতাল এখন হৃদরোগের চিকিৎসার জন্য দেশের অন্যতম স্বাস্থ্যসেবামূলক প্রতিষ্ঠান। বর্তমান শয্যাসংখ্যা দুই শতাধিক। এখানে হৃদরোগের সব ধরনের চিকিৎসা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা হচ্ছে।

কার্ডিয়াক সেবার পাশাপাশি কিছু বিষয় আমরা যুক্ত করেছি। যেমন হৃৎপিণ্ডের রক্তনালি বন্ধ হয়ে হার্ট অ্যাটাক হয়, অন্যদিকে পায়ের রক্তনালি বন্ধ হয়ে ভাসকুলার সমস্যা দেখা দেয়। এতে পা পচে যায়, একপর্যায়ে পা কেটে ফেলতেও হয়। একটা সময় ছিল যখন প্রচুর লোকের পা কেটে ফেলতে হয়েছে পেরিফেরাল ভাসকুলার ডিজিজের জন্য। আমরা এখানে ভাসকুলার সেন্টার চালু করেছি। আগে যেখানে মানুষের পা কেটে ফেলতে হতো, সেখানে এখন পা কাটার পরিমাণ ৬০ শতাংশ কমে গেছে। পায়েও এখন এনজিওগ্রাম করা হয়, হার্টের রক্তপ্রবাহ স্বাভাবিক করতে যেমন এনজিওগ্রাম করানো হয়, এনজিওগ্রাম করে রিং পরিয়ে দেয়া হয়। পরবর্তীতে কর্তৃপক্ষ চিন্তা করল কেবল পা বা হার্ট নয় মস্তিষ্কেও রক্তপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। মস্তিষ্কে রক্তনালি বন্ধ হয়ে স্ট্রোক হয়। এটা ভেবেই নিউরোসার্জারি চালু করি। রোগীর তুলনায় এখন শয্যা সংখ্যা অপ্রতুল। আমরা সবসময় উন্নতমানের সেবা দিতে চেষ্টা করি। এখানে যারা ভর্তি হন তাদের চিকিৎসার সবকিছু আমরা হাসপাতালের ভেতর থেকে সরবরাহ করি। এমন অনেক রোগী আসেন যাদের ঢাকায় থাকার জায়গা নেই, তারা দ্রুত চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরতে চান। আমরা তাদের কথা মাথায় রেখেই আধা ঘণ্টার মধ্যে রোগ নির্ণয় করে চিকিৎসাপত্র দিচ্ছি। এর সঙ্গে আধুনিক কার্ডিয়াক এ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস আমরা চালু করেছি। ঢাকায় এমন অনেক স্থান আছে যেখান থেকে যানজটের কারণে হাসপাতালে আসতে সময় লাগে। এ সময়ের জন্য রোগীর জীবন যাতে ঝুঁকিতে না পড়ে, হার্ট অ্যাটাকের প্রথম ২ ঘণ্টা খুব গুরুত্বপূর্ণ। যত দ্রুত সম্ভব হার্ট অ্যাটাকে চিকিৎসা নিতে হবে। যদি ১ ঘণ্টার মধ্যে রোগীকে চিকিৎসা দেয়া যায় তাহলে খুবই ভালো। ২ ঘণ্টার ভেতরে আনতে পারলে রোগীকে এনজিওগ্রাম করে তার হার্টের যে রক্তনালি বন্ধ হয়েছে তার চিকিৎসা করতে পারলে রোগীর প্রাণ রক্ষা হয়। হার্টের মাসল ড্যামেজ হওয়ার আগে চিকিৎসা দেয়া গেলে ভালো হয়।

হার্ট অ্যাটাকের রোগীদের দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনতে পারলে প্রায় শতভাগ ক্ষেত্রে প্রাণ বাঁচে। দেখা যায়, দ্রুত সময়ে রোগীকে চিকিৎসার আওতায় আনা যায় না। আপনার পর্যবেক্ষণ কী?
যেসব স্থানে দ্রুত চিকিৎসায় আনা যাচ্ছে না সেখনে জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। দ্রুত রোগ নির্ণয় করতে হবে যে হার্ট অ্যাটাক হয়েছে কিনা। যেমন মধ্য বয়স্ক ব্যক্তি, যার ওজন বেশি, ধূমপানের অভ্যাস আছে এবং ডায়াবেটিস আছে সে যদি বুকে চাপ অনুভব করে, ব্যথা অনুভব করে তাহলে সময় নষ্ট না করে নিকটস্থ হাসপাতালে গিয়ে ইসিজি, ট্রপোনিন আই ও অন্যান্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে চিকিৎসকরা রোগ নির্ধারণ করতে পারবেন। প্রাথমিক অবস্থায় যে হাসপাতালে নেয়া হচ্ছে সেখানে দক্ষ লোকবল থাকতে হবে। রোগীর অবস্থা বুঝে হাসপাতালে প্রাইমারি এনজিওগ্রাম বা প্রাইমারি এনজিওপ্লাস্টি অথবা হার্টের রক্তনালিতে জমাট রক্ত তরল করার জীবন রক্ষাকারী ওষুধ প্রয়োগ করার দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। শুরুতে যে হাসপাতালে নেয়া হয়েছে সেখানে পর্যাপ্ত কার্ডিয়াক চিকিৎসার ব্যবস্থা না থাকলে দ্রুত বিশেষায়িত হাসপাতালে নেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। আর যদি হার্ট অ্যাটাক হয়ে যায়, ওই অবস্থায় ক্যাথল্যাব প্রস্তুত করে প্রাইমারি চিকিৎসা দিতে হবে।

বাংলাদেশে হৃদরোগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অপ্রতুল। সেক্ষেত্রে কী করা যেতে পারে?
কার্ডিওলজিস্ট তৈরি হচ্ছে, দেশে আমাদের জেনারেল ফিজিশিয়ান (সাধারণ চিকিৎসক) যারা আছে তাদের প্রশিক্ষণ দেয়ার কাজ চলছে। সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনা আছে এ বিষয়ে। বেসরকারি হাসপাতাল হিসেবে ইব্রাহিম কার্ডিয়াক ডাক্তারদের প্রশিক্ষণ দেয়ার জন্য একটা কোর্সের ব্যবস্থা করেছি। চার মাসের এ কোর্সে আমরা গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয় সংযুক্ত করেছি। এটা করার ফলে জেনারেল ফিজিশিয়ানরা হার্ট অ্যাটাকের সময় কী করতে হবে, কী ব্যবস্থা নিতে হবে সেটা সহজেই জানতে পারবেন। আমাদের পরিকল্পনা আছে পর্যায়ক্রমে বাংলাদেশের সব জেনারেল ফিজিশিয়ানদের প্রশিক্ষিত করা, এই প্রশিক্ষণ কোর্সের নাম সিসিভিডি।

বাংলাদেশে পাঁচটি সরকারি মেডিকেল কলেজ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও অন্যান্য সেক্টর থেকে কার্ডিয়াক বিষয়ে এমএস ও এমডি ডিগ্রি দেয়। পর্যাপ্ততা নিয়ে আপনার মন্তব্য কী?
দেশের জনগণের চিকিৎসার জন্য দক্ষ জনবল দরকার। এনআইসিভিডি ও বিএসএমএমইউসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কার্ডিয়াকের উচ্চ ডিগ্রি দেয়া হচ্ছে। যেমন ইব্রাহিম কার্ডিয়াকসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানেও কার্ডিয়াক কোর্স চালু আছে। তবে এ সংখ্যা আরো বাড়ানো দরকার।

কার্ডিয়াক চিকিৎসার খরচ সব শ্রেণী-পেশার মানুষের সক্ষমতায় আনতে কী করা প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন?
এটা ব্যয়বহুল চিকিৎসা। তাই সরকারি হাসপাতালগুলোকে তাদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। আর স্বাস্থ্য বীমার ব্যবস্থা করতে হবে। সারা বিশ্বেই স্বাস্থ্য বীমার ব্যবস্থা করা হচ্ছে চিকিৎসার ব্যয় সবার সক্ষমতার মধ্যে আনতে। এখন আমাদের দেশের অনেক প্রতিষ্ঠান স্বাস্থ্য বীমায় জোর দিচ্ছে।

বর্তমানে শহর ও উপশহরের মতো গ্রামেও হৃদরোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। হৃদরোগ প্রতিরোধে কী পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে?
রোগ প্রতিরোধে আমাদের আগে দরকার জীবনযাত্রার পরিবর্তন। অনেকেই দেখা যায় তিন বেলা ভাত খাচ্ছেন। এটা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। তাদের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করতে হবে। নিয়মিত ব্যায়াম ও হাঁটাহাঁটি করা অভ্যাসে পরিণত করতে হবে। ওজন সীমিত রাখতে হবে। ধূমপান, তামাক, গুল পরিহার করতে হবে।

হৃদরোগের চিকিৎসায় বাংলাদেশীরা সম্পূর্ণরূপে দেশের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা রাখতে পারছে কিনা?
মানুষ এখন দেশের চিকিৎসা নিয়ে আস্থাশীল। হৃদরোগের সমস্যার জন্য প্রায় ৮০ ভাগ মানুষ দেশেই চিকিৎসা নিচ্ছে। কারণ সময়ের সঙ্গে এ চিকিৎসা উন্নত হচ্ছে। আমরাও চেষ্টা করে যাচ্ছি দেশের চিকিৎসাসেবা আরো ভালো করার জন্য।

কার্ডিয়াক হাসপাতাল পরিচালনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ কী প্রয়োজন?
কেবল কার্ডিয়াক হাসপাতাল নয়, যেকোনো হাসপাতাল পরিচালনার জন্য প্রয়োজন ভালো ব্যবস্থাপনা। যাতে রোগীর কোনো সমস্যা না হয়। হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নানান সমস্যা থাকবে সেটা ঠিক করার জন্য দক্ষতা থাকতে হবে। এর জন্য চিকিৎসক হতে হবে এমন নয়। হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় আসার আগে আমি হসপিটাল ম্যানেজমেন্টে মাস্টার্স করেছি। এমনকি আমি এখানে জয়েন করার আগে বারডেমের কার্ডিয়াক বিভাগের ব্যবস্থাপনায় যুক্ত ছিলাম। হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার সঙ্গে অনেকগুলো বিষয় জড়িত। এর ভেতর অন্যতম মানবিক গুণাবলি। মানুষের সেবা করার ইচ্ছা ও সততা। এসব মিলেই ম্যানেজমেন্ট। আমার দৃষ্টিতে বাংলাদেশের হসপিটাল ম্যানেজমেন্টে দুর্বলতা রয়ে গেছে। হসপিটাল ম্যানেজমেন্টের জন্য দক্ষ লোকবল তৈরি করতে হবে।