Text Interviews

স্বাস্থ্যসেবা দেয়ার ক্ষেত্রে আপস করা যাবে না

19 September 2021 | by Muhammad Shafiullah

মোহাম্মদ ফাইজুর রহমান। দেশের অন্যতম চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠান ইউনাইটেড হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা, সীমাবদ্ধতা ও উত্তরণের বিষয় নিয়ে সম্প্রতি বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মুহাম্মাদ শফিউল্লাহ।

করোনাকালে চিকিৎসাসেবায় ইউনাইটেড হাসপাতালের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানতে চাই।
স্বাধীনতার পর আমাদের স্বাস্থ্য খাতে অনেক অর্জন রয়েছে। প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও টারশিয়ারি স্বাস্থ্যসেবায় আমরা অনেক এগিয়েছি। আর অনেক কিছুই অর্জন করতে পারিনি। শুধু করোনার মানদণ্ডে ফিরলে হবে না। কারণ কভিড একদম ভিন্ন একটি বিষয়। পৃথিবীর উন্নত থেকে উন্নততর দেশও কভিড মোকাবেলায় বেগ পেয়েছে। এর প্রাথমিক কারণ হলো অনেক মানুষ একসঙ্গে অসুস্থ হয়েছে। কারণ এটি সংক্রামক ব্যাধি ছিল। একসঙ্গে এত মানুষ অসুস্থ হবে, এভাবে আসলে স্বাস্থ্যসেবার পরিকল্পনা করা যায় না। তবে এখনো টারশিয়ারি পর্যায়ে আমাদের চাহিদা ওভাবে হয়নি। অনেক মানুষ বিদেশে উন্নত চিকিৎসার জন্য যেত। আনুষ্ঠানিকভাবে বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়া ব্যক্তির সংখ্যা কম হলেও অনানুষ্ঠানিকভাবে এ সংখ্যা অনেক বেশি। চিকিৎসা ভিসা না নিয়ে অনেকে হয়তো ভিন্ন ভিসা নিয়ে বিদেশে গিয়ে একই সঙ্গে চিকিৎসা নিয়ে আসেন। এ চাহিদাটা আমরা তখনই অনুভব করি, যখন আমরা করোনা মহামারীর মধ্যে পড়ি। মহামারী শুরুর পর দেখা গেল, আগের মডেলটা কাজ করছে না। তখন স্বাস্থ্যসেবার প্রকৃত চাহিদাটি বুঝতে পেরেছি। তখন দেখতে পাই, আমাদের যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে, তার সঙ্গে টারশিয়ারি পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নের অনেক সুযোগ রয়েছে। যতসংখ্যক বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান হওয়ার কথা ছিল তা নেই। একই কারণে আমাদের চিকিৎসকও নেই। প্রতিষ্ঠান তৈরি হলে চিকিৎসকের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও এসে যাবে। এর সঙ্গে মেডিকেল, নার্সিং কলেজ ও ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের বিষয়ও আসবে। ঠিক তেমনি টারশিয়ারি পর্যায়ের জন্য এভাবে প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। এ অবস্থায় যখন আমরা করোনা পরিস্থিতিতে পড়লাম, তখন বিষয়টি নতুন হিসেবে সামনে এসেছে। প্রথমদিকে আমরা বুঝতে পারছিলাম না যে কীভাবে আর কী করা উচিত। এজন্য প্রথমে আল্লাহকে ধন্যবাদ যে আমাদের সব চিকিৎসক, কর্মীদের চেষ্টায় কাজ করতে পেরেছি। একই সঙ্গে আমাদের শেখার প্রক্রিয়াটা দ্রুতগতিতে হয়েছে। এ অবস্থায় আমাদের সাড়া দেয়া জরুরি ছিল। বেসরকারি খাতে যে প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করেছে, তার মধ্যে এগিয়ে ছিল আমাদের প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে আমরা প্রায় চার হাজার রোগীকে ভর্তি করে চিকিৎসা দিয়েছি। আর ৭৫ হাজার ব্যক্তিকে বহির্বিভাগে চিকিৎসা দিতে পেরেছি। এটা সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য বড় শিক্ষা।

প্রতি বছর বিশাল যে জনগোষ্ঠী চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে যায়, তারা করোনার কারণে এবার যেতে পারেনি। সেসব রোগীকে চিকিৎসা দেয়ার ক্ষেত্রে ইউনাইটেড হাসপাতাল কতটুকু ভূমিকা পালন করেছে?
এমন অনেক রোগীই এসেছে। তাদের আমরা সেবা দিতে পেরেছি। তবে কিছু গুরুতর বিষয় থাকে, যেমন কিডনি বা লিভার প্রতিস্থাপনের সেবা দিতে পারিনি। এসব সেবা দেশে হাতে গোনা দু-একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান দিতে পারে। তবে এর বাইরে মানুষ যেসব চিকিৎসা নিতে বিদেশে যায়, তার প্রায় ৯৫ ভাগ সেবা আমরা দিতে পেরেছি। তাদের নন-কভিড ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে চিকিৎসা দিতে পেরেছি। বিষয়টি রোগী ও আমাদের জন্য বড় একটি উপলব্ধি ছিল। আমাদের মধ্যে এমন আত্মবিশ্বাস এসেছে যে যেসব চিকিৎসার জন্য মানুষ বিদেশে যায়, তাদের সে চিকিৎসা আমরা দিতে পারি। আমরা তাদের প্রয়োজন মেটাতে পারছি। আবার যারা চিকিৎসার জন্য বাইরে যেত, তারা ভাবছে যে চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়া লাগত সেটি তারা এখানে পাচ্ছে। এখন বিষয়টি হলো সবাইকে আমরা চিকিৎসা দিতে পারব কিনা? এজন্য আমাদের আরো প্রতিষ্ঠান গড়তে হবে। চিকিৎসক ও নার্সসহ প্রয়োজনীয় কর্মীর সংখ্যা বাড়াতে হবে।

প্রতিষ্ঠান বাড়ানো বলতে আপনি কি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কথা বলছেন?
সরকারি ও বেসরকারি দুই ধরনের প্রতিষ্ঠানই হতে পারে। কারণ চাহিদা অনেক বেশি। একার পক্ষে তা মেটানো সম্ভব নয়। এটা শুধু সরকারের বিষয় নয়। এখানে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বড় ভূমিকা রয়েছে। রোগীরা স্বাস্থ্যসেবায় যা খরচ করে তার মধ্যে কিন্তু ৭০-৭৫ ভাগ বেসরকারি খাতে খরচ হয়। বেসরকারি খাতের একটি ভূমিকা রয়েছে। তবে সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও বাড়তে হবে। দুই পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানকেই গুরুত্ব দিতে হবে। শিক্ষামূলক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলো দুই পর্যায়েই হওয়া উচিত। কারণ চাহিদা বেশি।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বাড়লে শুধুই কি রোগীর আউট অব পকেট এক্সপেনডিচার বাড়বে নাকি সেবাও বাড়বে?
শুরুতেই দেখতে হবে রোগীদের বাড়তি খরচ কমানোর জন্য কী কী করা যেতে পারে। বাংলাদেশে স্বাস্থ্যের জন্য কোনো বীমার ব্যবস্থা নেই। এটা বাড়তি খরচ কমানোর ক্ষেত্রে বড় অন্তরায়। আপনি পৃথিবীর যত জায়গায়ই যাবেন, সেখানে কিন্তু স্বাস্থ্যসেবা সাধ্যের মধ্যে এসে যায় দুটি কারণে। সেগুলো হলো সরকারের ভর্তুকি ও স্বাস্থ্যবীমা ব্যবস্থা। সেটা বিভিন্ন দেশে বিভিন্নভাবে ব্যতিক্রমধর্মী পদ্ধতিতে করা হচ্ছে। আমাদের দেশে জীবন বীমার মাধ্যমে কিছু মানুষ সেই সুবিধা পায়, তবে তা ১ শতাংশেরও কম। ফলে বেশির ভাগ মানুষ যখনই চিকিৎসা নিচ্ছে, তখন তার পকেট থেকে খরচ হচ্ছে। এটা বড় বোঝা। যেভাবেই হোক স্বাস্থ্যসেবার খরচ কমাতে গিয়ে কিন্তু মানের সঙ্গে কোনো আপস করা যাবে না। গুণগত মান নিশ্চিত করতেই হবে। খরচ কমাতে হলে আমাদের প্রাপ্যতা, বীমা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যান্য দেশের মতোই যে আমরা পারব তা নয়। তবে আমাদের মতো একটি পদ্ধতি চালু করা যেতে পারে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে উন্নতি হলেও তা ভিন্ন খাতে হয়েছে। সেটা স্বাস্থ্যসেবা খাতে হয়নি। এক্ষেত্রে বীমা হলে মানুষ স্বাস্থ্যসেবার প্রবৃদ্ধি ঘটাতে পারবে। যেখানে ভালো স্বাস্থ্যসেবা পাবে মানুষ সেখানেই যাবে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যখন মানসম্মত হবে তখন কিন্তু সরকারি প্রতিষ্ঠানও ভালো মানের হবে। প্রতিযোগিতা বাড়বে। এখন সরকারি হাসপাতাল অনেক রোগীকে চিকিৎসা দেয়। তাদের ওপরও চাপ কমবে।
তবে সবচেয়ে বড় বিষয়টি হলো স্বাস্থ্যসেবাকে একটি ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে দেখা দরকার। আমাদের এখন একটি ৩৬০ ডিগ্রি পদ্ধতি দরকার। যেমন পোশাক শিল্পকে আশির দশকে নীতি বা অন্যান্য সুবিধা দেয়া হয়েছিল, স্বাস্থ্যসেবা খাত কিন্তু সেভাবে সুবিধা পায়নি। আমরা পোশাক, সিরামিক, তথ্যপ্রযুক্তিকে যত গুরুত্ব দিচ্ছি, স্বাস্থ্যসেবাকে তার চেয়েও বেশি গুরুত্ব দেয়া দরকার। এটার মাধ্যমে একটা সমন্বিত নীতি আসবে। আমাদের যত সহযোগিতা সরকার করুক, তা হতে হবে সমন্বিত নীতির মাধ্যমে। বেসরকারি খাতে বড় বড় হাসপাতাল, চিকিৎসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হতে হবে। যাতে বেশি বেশি মানুষকে আমরা ব্যবস্থাপনার মধ্যে আনতে পারি। সরকার এ বিষয়টিতে যথেষ্ট মনোযোগী। সেবাকে ঢাকার বাইরে বিকেন্দ্রীকরণের জন্য সরকার চেষ্টা করছে। এখন মানুষ এ খাতে বিনিয়োগের জন্য আগ্রহী হচ্ছে। শুল্ক-কর মওকুফ অবস্থায় যন্ত্রপাতি আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চিকিৎসা সরঞ্জাম আমদানিতে উচ্চ কর থাকে। কাস্টমস, ভ্যাট এগুলো মিলিয়ে ৩০-৪০ শতাংশ দাম বেড়ে যায়। এগুলো কমিয়ে আনতে হবে। এসব না কমালে এর ভার কিন্তু সেবামূল্যের ওপরও পড়ে। একই সঙ্গে আমরা যেসব প্রতিষ্ঠান থেকে যন্ত্রপাতি বা আনুষঙ্গিক উপকরণ আনছি তা অন্যান্য দেশ কোন দামে কিনছে, সেটিও দেখা দরকার। এখানে কোনো ঘাটতি থাকলে তার জন্যও আলোচনা করতে হবে। এ জায়গার ক্ষেত্র উন্নয়নের জন্য সরকার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনায় আসতে হলে সমতা থাকতে হবে। তখন আমাদের খরচ কম হবে।

আমাদের দেশের সঙ্গে অন্যান্য দেশের চিকিৎসা ব্যয়ের পার্থক্য নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী? বেসরকারি খাত উন্নয়নে সরকারের কাছ থেকে কেমন উদ্যোগ প্রত্যাশা করেন?
সিঙ্গাপুর, ব্যাংকক এসব দেশের সঙ্গে আমাদের তুলনা করা যাবে না। যারা বলে তারা জেনে বলে না। আমাদের দেশে যে সেবার জন্য ৪-৫ লাখ টাকা ব্যয় হবে, সিঙ্গাপুরে তা ৫০ লাখ টাকা হবে। তাদের খরচ বেশি। ব্র্যান্ড ভ্যালুর কারণে, ভালো সার্ভিসের কারণে আমরা তাদের সঙ্গে তুলনায় আসতে পারি না। তবে ভারতের সঙ্গে তুলনায় আসতে পারি। কারণ বাংলাদেশ ও ভারত দুই দেশেই শ্রমের মূল্য একই ধরনের। তবে তাদের খরচ কম হয় বিভিন্ন ব্যবস্থাপনার কারণে। এসব ব্যবস্থাপনা আমাদের নেই। সেখানে সরকারের ভর্তুকি থাকতে পারে বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পরিধি বড় হওয়ার কারণে বেশি মানুষ সেবা নেয়। ফলে তারা কম মূল্যে সেবা দিতে পারে। সরকারি হস্তক্ষেপ থাকলে আমাদের জন্য অনেক সহজ হবে। যেমন যে রোগ নির্ণয়ের যন্ত্র আমরা সাড়ে ১৪ কোটি টাকায় কিনেছি, সেই খরচ আমি কাদের ওপর দেব। এখানে ২০ কোটি টাকার বেশি দিয়ে রেডিয়েশন মেশিন কিনেছি। ক্যান্সারের রোগীর চিকিৎসার জন্য এমনিতেই পরিবার বিপাকে পড়ে। এগুলো ভারতে কম খরচে পাচ্ছে। বিষয়গুলো আমাদের দেখা দরকার। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা দিতে গেলে একটি কাজের জন্য অনেক লোক প্রয়োজন। অন্যান্য খাতে কিন্তু একজনের কাজ অন্যজন করতে পারে। কিন্তু স্বাস্থ্যসেবায় একজন রোগীকে সেবা দিতে হলে অনেক মানুষের সমন্বয় প্রয়োজন হয়। ছুটির সময়ও সেবা দিতে গেলে বিকল্প লোকবলের প্রয়োজন হয়। এখানে কিন্তু কর্মসংস্থানের সুযোগও বেশি। স্বাস্থ্যসেবার বহুমুখী সুবিধা অন্যান্য খাতে কিন্তু নেই। এটা নিশ্চিত করতে পারলে উন্নত দেশের রোগীরাও আমাদের দেশে চিকিৎসার জন্য আসবে।

রোগ প্রতিরোধ ও স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নে বেসরকারি খাতের কী ভূমিকা হতে পারে?
মানুষ অসুস্থ হবে এবং হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা নেবে এটা কোনো মডেল হতে পারে না। স্বাস্থ্যসেবার মডেল হতে হবে, মানুষের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধে গুরুত্ব দেয়া। তার পরও কোনো মানুষ অসুস্থ হলে তখন চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে যাবে। এমন বিষয় আমাদের মতো দেশের জন্য খুবই প্রযোজ্য। কারণ এ দেশে অল্প জায়গার মধ্যে ১৭-১৮ কোটি মানুষ বাস করে। ব্যক্তি খাতে আমাদের উচিত মানুষকে পরামর্শ দেয়া। এ কাজ আমরা শুরু করেছি। কী করলে মানুষ ভালো থাকবে সেটা জানানো। এখানে দুটি বিষয় জরুরি। একটি হচ্ছে, বিভিন্ন মাধ্যমে মানুষকে জানানো যে কীভাবে তারা ভালো থাকবে, কী করলে সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত হবে। আরেকটি বিষয় হলো নিয়মিত চেকআপ করা। যদিও খরচের জন্য মানুষ বিষয়টিতে আগ্রহী হয় না। তবে সুস্বাস্থ্য নিশ্চিতের জন্য চেকআপ গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে বীমা প্রয়োজন। যেন মানুষ সেবা পেতে আগ্রহী হয়। বাংলাদেশে সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় না হওয়ার কারণে চিকিৎসায় অনেক রোগী সুস্থ হয় না। যেমন ক্যান্সারের রোগীরা যখন চিকিৎসার জন্য আসে, তখন তাদের অসুস্থতা চূড়ান্ত পর্যায়ে থাকে। সে সময় চিকিৎসকদের কিছু করার থাকে না। অথচ প্রথমে রোগ শনাক্ত করা গেলে যথাযথ চিকিৎসার মাধ্যমে হয়তো তাদের বাঁচানো যেত। ক্যান্সারের অনেক রোগী আমরা পাচ্ছি গ্রেড ফোরে। শরীরটা কিন্তু অন্যান্য যন্ত্রের চেয়ে আগে সতর্ক বার্তা দেয়। সেক্ষেত্রে নিয়মিত স্ক্রিনিং করতে হবে। মানুষকে সুস্বাস্থ্য নিয়ে বাঁচার জন্য পরামর্শ দেব। পরে অসুস্থ হলে চিকিৎসা দেয়া হবে। এমনভাবেই আমরা এগিয়ে যাচ্ছি।

বাংলাদেশে হৃদরোগ চিকিৎসায় ইউনাইটেড হাসপাতালের কার্ডিয়াক কেয়ার সেন্টারের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। তবে নেতৃত্ব দানকারী ইনস্টিটিউট হিসেবে আগামী প্রজন্ম তৈরির ক্ষেত্রে আপনাদের কার্যক্রম কী?
আমাদের হাসপাতাল হলো ইউনাইটেড গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠান। আমাদের গ্রুপ স্বাস্থ্যসেবা দেয়ার ক্ষেত্রে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। আমাদের গ্রুপ আরো তিনটি প্রতিষ্ঠান স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মোট ১ হাজার ৭০০ শয্যার সেবা দেয়ার বিষয়ে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি। দুই-তিন বছরের মধ্যে এগুলো বাস্তবায়ন করব। দুভাবে আমরা কাজ করছি, কিছু প্রতিষ্ঠানকে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে করছি আবার কিছু প্রতিষ্ঠান ট্রাস্টের আওতায় করছি। আমরা এখান থেকে কোনো লভ্যাংশ নেব না। জামালপুরে ২৫০ শয্যার একটি হাসপাতাল হচ্ছে। শিগগিরই আমরা এ কার্যক্রম শুরু করছি। এখানে পুরো বিনিয়োগ ইউনাইটেড গ্রুপের। তবে এখানে লাভের চিন্তা করা হচ্ছে না। কিছুসংখ্যক মানুষ সেবার মূল্য দেবে, বাকিদের ওই টাকা দিয়েই সেবা দেয়া হবে। এখানে কোনো ঘাটতি দেখা দিলে বছর শেষে তা পূরণ করতে ইউনাইটেড গ্রুপ চেষ্টা করবে। এ মডেলে সাফল্য পেলে আমরা আরো কিছু করব। পাশাপাশি দুটি মেডিকেল কলেজ হবে। আমাদের মেডিকেল কলেজের অনুমতি রয়েছে। জায়গা নিবন্ধন করা হয়েছে। ভবনের কাজও শুরু হয়েছে। একটা ঢাকায়, আরেকটা চট্টগ্রামে—পিপিপির আওতায় বাংলাদেশ রেলওয়ের সঙ্গে। আমরা অন্যান্য অঞ্চলেও প্রতিষ্ঠান গড়ার জন্য সুযোগ নিচ্ছি। এটা দক্ষিণবঙ্গ বা উত্তরবঙ্গেও হতে পারে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বৃদ্ধির মাধ্যমে আমরা প্রকৃতপক্ষে সেবাকে ছড়িয়ে দিতে চাচ্ছি। এর মাধ্যমে আমাদের দক্ষতাকে ছড়িয়ে দিতে চাই। আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি, তরুণ চিকিৎসকরা যেন উঠে আসেন। পরে তারা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে পড়বেন। তারাই তখন সেসব প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন বিভাগের দায়িত্ব নিতে পারবেন। দক্ষ হিসেবে গড়ে উঠবেন।

স্বাস্থ্যসেবায় বেসরকারি খাতের মতো সরকারি খাত এগিয়েছে কিনা? বেসরকারি খাতে চিকিৎসা ব্যয় বেশি নেয়াটা কতটুকু যৌক্তিক?
সরকারি প্রতিষ্ঠান এগিয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে মানুষ কত তা ভুললে চলবে না। ভারত কিন্তু অনেক পরিকল্পনা করে স্বাস্থ্য খাতকে এগিয়ে নিয়েছে। তারা প্রায় ৪০ বছর ধরে স্বাস্থ্যসেবা খাতকে এগিয়ে নিয়েছে। আমরাও কিন্তু চাইলে ১০ বছরে সেই জায়গায় যেতে পারব। কারণ আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। করোনার সময় স্বাস্থ্যসেবায় আমূল পরিবর্তন আনতে পেরেছি। টিকা কার্যক্রমেও এগিয়ে গিয়েছি। সরকারিভাবে অন্যান্য দেশের সঙ্গে দরকষাকষিতে যেতে পারছি। তবে সামগ্রিকভাবে যেভাবে এগিয়ে যাওয়া প্রয়োজন সেভাবে হয়নি। স্বাস্থ্যসেবাকে শিল্প হিসেবে নিয়ে সামগ্রিকভাবে এগিয়ে গেলে ভালো করব। এখানে অনেক কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে। আমাদের ওষুধ শিল্পও অনেক ভালো করছে। আমরা স্বপ্ন দেখি, মেডিকেল ট্যুরিজম এ দেশে হবে।
স্বাস্থ্যসেবা দিতে গেলে তাতে কোনো আপস করা যাবে না। নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি রোগীর খরচ কিন্তু ওষুধ ও রোগ নিরীক্ষণের কারণে বেড়ে যায়। এখানে মানের সঙ্গে আপস করা সম্ভব না। যন্ত্রাংশ কেনার ক্ষেত্রে কর-শুল্ক কমানো হলে কম খরচে সেবা দেয়া যাবে। মানুষকে সেবার মধ্যে আনতে পারলে অনেক অপ্রত্যাশিত খরচ থেকে বের হওয়া যাবে। আউট অব পকেট এক্সপেনডিচার ৫ থেকে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনতে হবে। স্বাস্থ্যবীমা চালু করতে হবে। প্রত্যেক সেলফোন ব্যবহারকারীর কাছ থেকে মাসে ১০ টাকা করে নিয়ে তা তাদের চিকিৎসায়ও কিন্তু ব্যয় করা যায়। এর জন্য খুব বড় ধরনের ঝামেলায় পড়তে হবে না। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন কার্যক্রমের ব্যয় একত্র করে সরকার ব্যয় করতে পারে। সরকার জাকাতের টাকাও স্বাস্থ্যসেবায় ব্যয় করার উদ্যোগ নিতে পারে। সরকার এসব বিষয়ে সুবিধা দিলে বিনিয়োগকারীরা এগিয়ে আসবেন।