Text Interviews

সর্বজনীন স্বাস্থ্য বীমা চালুর লক্ষ্যে বাজেটে বরাদ্দ রাখা যেতে পারে

31 May 2022 | by Muhammad Shafiullah

দেশে বেসরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা ও ওষুধ উৎপাদন খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগ রয়েছে ল্যাবএইড গ্রুপের। আগামী অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে বেসরকারি চিকিৎসাসেবা খাত ও ওষুধ শিল্পে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন ল্যাবএইডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. এএম শামীম। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মুহাম্মাদ শফিউল্লাহ।

রোগ নির্ণয়ের যন্ত্রপাতি আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক বেশি—এমন কথা দীর্ঘদিন ধরে শোনা যাচ্ছে। শুল্ক কমালে রোগীদের ওপরেও ব্যয়ের বোঝা কমবে—এমনটিও দাবি করা হচ্ছে। কী ধরনের সুবিধা প্রত্যাশা করছেন?

স্বাস্থ্যসেবায় রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে আমদানীকৃত যন্ত্রপাতি অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এর সঙ্গে বিভিন্ন কর ও শুল্ক প্রায় ১৩-১৫ শতাংশ যোগ হয়। ফলে আমদানীকৃত যন্ত্রপাতির দাম আরো বেড়ে যায়। রোগীদের স্বাস্থ্যসেবা নেয়ার খরচের ওপর যা কিছুটা চাপ সৃষ্টি করে। এছাড়া ডলার ও অন্যান্য বৈদেশিক মুদ্রায় আমদানি দায় মেটানোর ফলে অতিরিক্ত অর্থ সমন্বয় করতে হয়। যন্ত্রপাতি আমদানিকালে ৫ শতাংশ অগ্রিম কর (এটি) দিতে হয়, যা ফেরতযোগ্য। আমাদের বাস্তবতায় এই ফেরত পাওয়ার প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল ও সময়সাপেক্ষ। স্বাস্থ্য খাতের গুরুত্ব বিবেচনায় মূলধনি যন্ত্রপাতির ক্ষেত্রে এটি প্রত্যাহার করা যেতে পারে। এতে সরকারি রাজস্ব ঠিক রেখেও পদ্ধতিগত জটিলতা নিরসন করা সম্ভব।

হাসপাতালের আয় দিয়ে সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের উন্নয়নের জন্য বাজেটে কী নীতি রাখা যেতে পারে?

হাসপাতালে অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতিতে বিনিয়োগে প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে হয়। এ অর্থ জোগান দেয়ার জন্য উচ্চসুদে মূলধন সংগ্রহের পাশাপাশি বিনিয়োগের ঝুঁকিও থেকে যায়। প্রাথমিকভাবে চার থেকে পাঁচ বছর লোকসান গুনতে হয়। অন্যদিকে দেশে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা গড়ে তুলতে পারলে বিদেশমুখী প্রবণতা কমানোর মাধ্যমে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করা যেতে পারে। স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগের অপরিসীম গুরুত্ব বিবেচনায় যথাযথ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ এবং এ খাতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করার লক্ষ্যে বিদ্যমান স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের করযোগ্য আয়ের ৫০ শতাংশ পর্যন্ত সম্প্রসারিত প্রকল্পে বিনিয়োগকে আয়কর অব্যাহতি দেয়া যেতে পারে। এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় নীতিমালা প্রণয়ন করা হলে দীর্ঘমেয়াদি সরকারি রাজস্ব বৃদ্ধিতে এ খাত অবদান রাখতে পারবে। পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়, কর্মসংস্থানসহ নানা সুবিধা পাওয়া যাবে।

মানহীন ও নিয়ম না মানা চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে রোগীরা প্রতারিত হচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে?

স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোকে গ্রেডিংয়ের আওতায় এনে সংশ্লিষ্ট মান অর্জন ও বজায় রাখা নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে ঘাটতি ও দুর্বলতা থেকে উত্তরণের জন্য সময়সীমা বেঁধে দিতে হবে। অন্যথায় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এমনকি লাইসেন্সও বাতিল করা যেতে পারে। তবে হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার স্থাপনের জন্য নিবন্ধনের প্রক্রিয়া জটিল। এ বিষয়ে এক জায়গায় সব কাজ সম্পন্ন করতে পারলে ভালো। অনেক সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান থেকে কাগজপত্র সংগ্রহ করতে হয়। এতে নানা জটিলতার সৃষ্টি হয়। ইপিজেডে যেমন একটি প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধনের জন্য একই জায়গা থেকে সব সেবা পাওয়া যায়, এমন করা হলে ভালো হবে। স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলো এক স্থান থেকে তার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পেলে সহজেই স্বাস্থ্যসেবা দিতে পারবে।

স্বাস্থ্য বীমার ক্ষেত্রে বাজেট কী ভূমিকা রাখতে পারে?

স্বাস্থ্য বীমা আমাদের দেশে স্বাস্থ্যসেবা খাতে একটি নতুন ধারণা। মানুষের জরুরি চিকিৎসা যাতে অর্থের অভাবে বন্ধ না হয় সেজন্য সর্বজনীন স্বাস্থ্য বীমা চালু করা যেতে পারে। বাজেটে এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ রাখা যেতে পারে। এ ব্যবস্থায় রোগীরা তাদের চাহিদামাফিক স্বাস্থ্যসেবা দেশের মধ্যে থেকেই গ্রহণ করতে পারে। সর্বজনীন পলিসির আওতায় সরকার সরাসরি চিকিৎসা ব্যয় পরিশোধ বা ভর্তুকি দিতে পারে। এতে নিম্ন আয়ের ও ছিন্নমূল জনগোষ্ঠীর চিকিৎসাসেবা সহজ হবে।

চিকিৎসাসেবার মান ও পরিধি বৃদ্ধিতে বাজেট কীভাবে ভূমিকা রাখতে পারে?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) প্রকাশিত স্বাস্থ্য খাতের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৪৯ শতাংশ মানুষ প্রয়োজনের সময় মানসম্পন্ন চিকিৎসাসেবা পায় না। এছাড়া জিডিপির হিসাবে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাংলাদেশে সবচেয়ে কম। তাই চিকিৎসাসেবার মান ও পরিধি বৃদ্ধির জন্য স্বাস্থ্য বীমার পাশাপাশি বরাদ্দ বৃদ্ধি ও সেবার গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী তথা জনবল তৈরির লক্ষ্যে প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেয়া আবশ্যক।

দেশীয় ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত পণ্য রফতানিতে বাজেটে কী প্রত্যাশা রয়েছে?

বাংলাদেশে ওষুধ শিল্পের বিকাশ শুরু হয়েছে বহু আগে। তথ্যপ্রযুক্তি বা পোশাক খাতে সরকার কিছু ঋণ সুবিধা ও রফতানির ক্ষেত্রে প্রণোদনা দেয়। বাংলাদেশে আমরা প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার ওষুধ উৎপাদন করি। আর বিদেশ থেকে ৬০০ থেকে ৮০০ কোটি টাকার ওষুধ বাংলাদেশে আসে। গত অর্থবছরেও প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার ওষুধ রফতানি হয়েছে। করোনার কারণে কিছু ওষুধ রফতানি বেশি হয়েছে। ওষুধ রফতানিতে সরকারি প্রণোদনা তেমন নেই। স্থানীয় বাজারে ওষুধের ক্ষেত্রে কোনো প্রণোদনা নেই। রফতানির ক্ষেত্রে ৮-১০ শতাংশের মতো প্রণোদনা রয়েছে। আমাদের রফতানিও অন্যান্য দেশের মতো হচ্ছে না। কেননা বিদেশের বড় বড় প্রতিষ্ঠান রফতানির ক্ষেত্রে লবিস্ট নিয়োগ করে। আমরা যে ওষুধ ২০ সেন্টে বিক্রি করি, তা তারা দেখা যায় ২ ডলারে বিক্রি করে। ওরা কখনো আমাদের দেশের ওষুধগুলোকে বড় বাজারে প্রবেশ করতে দেয় না। কম প্রতিযোগিতামূলক বাজারে আমাদের ওষুধ যায়। আমরা ওষুধ রফতানিতে বড় পর্যায়ে যেতে পারব না। কেননা বিদেশী বড় বড় ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের বাজেট প্রায় আমাদের জাতীয় বাজেটের সমান। যেমন এফডিএর অনুমতি পেলেও নির্দিষ্ট জায়গায় আমাদের দেশের দু-একটি ওষুধ যায়। সব জায়গায় যেতে দেয়া হয় না। আমাদের ভালো দিক হলো, গত ৬৫ বছরে আমাদের ওষুধের বাজার একটা জায়গা দখল করেছে। আমরা মার্কেটিং করছি। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার অনুমোদন পাচ্ছি। আমাদের সাধারণ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর চেয়ে ওষুধ শিল্প আরো গোছানো। ওষুধ শিল্পের জন্য কিছু নির্দিষ্ট মেয়াদে যদি কর মওকুফ করা যায়, প্রণোদনা দেয়া যায়, যন্ত্রাংশ আমদানির ক্ষেত্রে কিছু কর মওকুফের ব্যবস্থা থাকে তাহলে এ শিল্প দেশে ও রফতানির ক্ষেত্রে আরো প্রসার লাভ করবে।

এপিআই পার্কে বহু প্রতিষ্ঠান যাচ্ছে না। সেখানে কারখানা করতে বাজেটে কি আপনারা কোনো সুবিধা প্রত্যাশা করেন?

এপিআই পার্কে প্রায় ৮০টি ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান প্লট পেয়েছে। যেমন বহুল চাহিদাসম্পন্ন ওষুধের কাঁচামাল যদি একটির বেশি প্রতিষ্ঠান তৈরি করে তাহলে এর চাহিদা থাকবে না। মুক্ত আলোচনার মাধ্যমে যদি প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়, তারা কোন কোন ওষুধের কাঁচামাল তৈরি করবে তাহলে ভালো হবে। সেক্ষেত্রে এসব কাঁচামাল রফতানিরও ব্যবস্থা রাখতে হবে। এপিআই পার্কে যদি ৫০টি প্রতিষ্ঠান বছরে ৫০০ কোটি টাকার কাঁচামালও সরবরাহ করে তাহলেও কিন্তু তাতে ২৫ হাজার কোটি টাকা হয়ে যাবে। ওষুধকে পোশাক খাতের সঙ্গে তুলনা করা যাবে না। উদ্ভাবনী প্রতিষ্ঠান ওষুধ বানানোর পর আমরা সে ওষুধ তৈরি করলে এবং তাতে পরীক্ষা করলে কিন্তু বেশি পার্থক্য পাওয়া যায় না। প্রায় ৩ শতাংশ পার্থক্য থাকে। আমার মতে, এপিআই পার্কের বিষয়ে সব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরকারের পরামর্শ করে তবেই ব্যবসার ভবিষ্যৎ পরিকল্পায় এগিয়ে যেতে হবে। এপিআই পার্কে শুধু প্লট দিলেই হবে না।

ওষুধের কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক নিয়ে বাজেটে আপনাদের প্রত্যাশা?

কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে প্রায় ৩৫ শতাংশ খরচ হয়ে যায়। এখানে আমরা সরকারের কাছে শুল্ক রেয়াতের সুবিধা চাইতে পারি। তবে সরকার যদি সব মওকুফ করে তাহলে চলতে পারবে না। এখন আগের চেয়ে ঔষধ প্রশাসন আরো সহযোগিতামূলক সংস্থা হিসেবে গড়ে উঠেছে। এক-তৃতীয়াংশ ওষুধের মূল্য সরকার বেঁধে দেয়। অনেক ক্ষেত্রে কোনো কোনো ওষুধের কাঁচামালের দাম আট-দশ গুণ বেশি থাকে। এছাড়া যে প্রতিষ্ঠানের কাঁচামাল ভালো, সে প্রতিষ্ঠানের ওষুধের দাম কিছুটা বেশি থাকবেই। তবে ওষুধের বিষয়ে সরকার অত্যন্ত সহযোগিতামূলক কাজ করছে। ফলে দেশের ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলো এগিয়ে যাচ্ছে। মানুষের আস্থা অর্জন করেছে।