প্রাপ্তবয়স্কের ১৩ শতাংশ ডায়াবেটিস রোগী

  • পরিশ্রম না করা ও অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাসসহ বিভিন্ন কারণ।
  • ডায়াবেটিস বৃদ্ধি পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।
  • বাংলাদেশে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ আশানুরূপ নয়: বিশেষজ্ঞ
  • টাইপ-২ ডায়াবেটিস বেশির ভাগ ক্ষেত্রে প্রতিরোধযোগ্য।

দেশে ডায়াবেটিস (বহুমূত্র) রোগীর সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর ১৩ শতাংশই ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। ডায়াবেটিসের এমন উপস্থিতির কারণে অন্যান্য অসংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাবও বাড়ছে। সে কারণে ডায়াবেটিস রোগী বৃদ্ধির এই ঊর্ধ্বগতি পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপরই চাপ সৃষ্টি করছে এবং জনশক্তিকে দুর্বল করে তুলছে বলে জনস্বাস্থ্যবিদেরা অভিমত দিয়েছেন।

আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশন (আইডিএফ) জানিয়েছে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলে বর্তমানে প্রায় ১০ কোটি ৭০ লাখ মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। ২০৫০ সালে এ সংখ্যা বেড়ে সাড়ে ১৮ কোটিতে পৌঁছাবে। এখন বাংলাদেশে ১১ কোটি ৩০ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মধ্যে প্রায় ১৩ শতাংশই ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। অর্থাৎ প্রায় ১ কোটি ৩৮ লাখ ৭৭ হাজার মানুষ এ রোগে ভুগছেন।

সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বার্ষিক প্রকাশনা ‘হেলথ বুলেটিন’-এর সর্বশেষ সংস্করণে বলা হয়েছে, দেশে অসংক্রামক রোগগুলো এখন প্রধান অসুস্থতা ও মৃত্যুর কারণ হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে প্রধান রোগগুলো হলো ডায়াবেটিস, হৃদ্‌রোগ, ক্যানসার এবং ফুসফুসের সমস্যাসহ শ্বাসতন্ত্রের বিভিন্ন অসুখ (সিওপিডি)। দেশে মোট মৃত্যুর ৭০ দশমিক ২৬ শতাংশই ঘটছে অসংক্রামক রোগের কারণে। আবার অসংক্রামক রোগের মোট মৃত্যুর মধ্যে ৩৪ শতাংশ হৃদ্‌রোগ, ১৪ শতাংশ ক্যানসার, ৭ শতাংশ সিওপিডি, ৪ শতাংশ ডায়াবেটিস, ১১ শতাংশ অন্যান্য অসংক্রামক রোগ, ২৩ শতাংশ সংক্রামক রোগ এবং ৭ শতাংশ আঘাতের কারণে ঘটছে।

ডায়াবেটিস একটি হরমোন-সংক্রান্ত রোগ। মানবদেহের অগ্ন্যাশয় ইনসুলিন নামের হরমোনটি পর্যাপ্ত পরিমাণে তৈরি করতে ব্যর্থ হলে বা দেহে উৎপন্ন ইনসুলিন ঠিকমতো কাজ না করলে রক্তে শর্করার (সুগার) মাত্রা নিয়ন্ত্রিত থাকে না। এ অবস্থাই হলো ডায়াবেটিস। বারবার মূত্রত্যাগ করা অন্যতম বৈশিষ্ট্য বলে এর বাংলা নাম বহুমূত্র। সাধারণত চার ধরনের ডায়াবেটিস রয়েছে—টাইপ-১, টাইপ-২, গর্ভকালীন এবং অন্যান্য। টাইপ-১ ডায়াবেটিসে অগ্ন্যাশয় ইনসুলিন উৎপাদন করতে প্রায় সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। তাই রোগীকে জীবনধারণের জন্য অবশ্যই ইনসুলিন নিতে হয়। আর টাইপ-২ ডায়াবেটিসে দেহে উৎপন্ন ইনসুলিন ঠিকমতো কাজ করে না।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, অস্বাস্থ্যকর জীবনাচার, ভেজাল খাদ্য ও দূষণের কারণে দেশে বিভিন্ন অসংক্রামক রোগ বাড়ছে। এর মধ্যে ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপই সবচেয়ে বেশি। ডায়াবেটিস রোগী যদি উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হন তবে, তাঁর কিডনি জটিলতা, অন্ধত্ব ও অন্যান্য গুরুতর সমস্যার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক বৈজ্ঞানিক জার্নাল বিএমসি পাবলিক হেলথে দুই বছর আগে বাংলাদেশ ও অস্ট্রেলিয়ার এক যৌথ গবেষণা প্রকাশিত হয়। ওই গবেষণায় দেখা গেছে, ১০ বছর বা তার বেশি সময় ধরে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপের হার সবচেয়ে বেশি। দীর্ঘদিন ডায়াবেটিসে ভোগা রোগীদের ৭৩ শতাংশ উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। দীর্ঘমেয়াদি ইনসুলিন ও ওষুধ সেবনেও তাঁদের ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে আসে না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বলছে, ২০২১ সালে বিশ্বব্যাপী ডায়াবেটিস এবং ডায়াবেটিসজনিত কিডনির রোগে প্রায় ২০ লাখ মানুষ মারা গেছেন। আর রক্তে উচ্চমাত্রার শর্করা হৃদ্‌রোগে মৃত্যুর ১১ শতাংশের জন্য দায়ী।

বাংলাদেশে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ আশানুরূপ নয় বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় অধ্যাপক এবং বাংলাদেশে ডায়াবেটিক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ডা. এ কে আজাদ খান। তিনি আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘বাংলাদেশে শনাক্ত রোগীর মাত্র ১৫-২০ শতাংশের রোগ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। প্রায় ৫০ শতাংশ আক্রান্ত রোগী এখনো শনাক্তই হয়নি। অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে সরকারকে আরও জোরদার পদক্ষেপ নিতে হবে।’

ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুযায়ী, টাইপ-২ ডায়াবেটিস বেশির ভাগ ক্ষেত্রে প্রতিরোধযোগ্য। এটি সাধারণত অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, অতিরিক্ত ওজন, মানসিক চাপ, ধূমপান, অ্যালকোহল সেবন এবং জেনেটিক (বংশগত) কারণে হয়। নিয়মিত রক্তে শর্করা পরীক্ষা করা ডায়াবেটিস প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করতে সাহায্য করে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. শাহ মনির হোসেন আজকের পত্রিকাকে বলেন, ডায়াবেটিস বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বংশগত। কিছু ক্ষেত্রে স্থূলতার কারণেও হয়ে থাকে। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য যেমন শারীরিক কার্যক্রম বাড়ানো প্রয়োজন, তা নগর জীবনে যথাযথভাবে করা সম্ভব হচ্ছে না। ঢাকা বা অন্যান্য বড় শহরে হাঁটার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা নেই। সরকার এখানে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে।

Share the Post: